নিজস্ব প্রতিবেদক:
মুন্সিগঞ্জ গজারিয়া উপজেলা দীর্ঘ অর্ধশতকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জাতীয় সংসদে নিজেদের প্রতিনিধি পেল গজারিয়া উপজেলার বাসিন্দারা। ৫৪ বছর পর গজারিয়ার সন্তান সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হওয়ায় আনন্দে ভাসছে পুরো জনপদ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুন্সিগঞ্জ-৩ (সদর–গজারিয়া) আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ধানের শীষ প্রতীকে জয়ী হয়েছেন গজারিয়ার কৃতী সন্তান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান রতন।এর আগে সর্বশেষ ১৯৭৩ সালে এই আসন থেকে গজারিয়ার সন্তান হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন কেএম শামছুল হুদা। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত থাকার পর রতনের এই জয়কে গজারিয়াবাসী দেখছেন ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে। অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে মো. কামরুজ্জামান রতন পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৯১ ভোট।তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিন পেয়েছেন ৮৮ হাজার ৯৩৬ ভোট। ফলে ৩৫ হাজার ৭৫৫ ভোটের ব্যবধানে নিশ্চিত হয় রতনের বিজয়।গজারিয়া অংশে ধানের শীষের ভোট ছিল চোখে পড়ার মতো। এখানে রতন পেয়েছেন ৪৬ হাজার ৮৬৬ ভোট, বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী পেয়েছেন ২০ হাজার ৪৯২ ভোট। শুধু গজারিয়াতেই ধানের শীষের লিড দাঁড়ায় ২৬ হাজার ৩৭০ ভোট—যা স্থানীয় জনসমর্থনের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। ভৌগোলিক কারণে মুন্সিগঞ্জ সদর থেকে বিচ্ছিন্ন গজারিয়া উপজেলা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। গজারিয়ায় মোট ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৩০ জন, অন্যদিকে সদর উপজেলায় ভোটার ৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৩৭ জন। নদীর এপার-ওপারের এই ব্যবধান রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।কামরুজ্জামান রতনের বিজয়ের মধ্য দিয়ে সেই বৈষম্যের অবসান ঘটবে এবং গজারিয়া এক নতুন উন্নয়ন যুগে প্রবেশ করবে—এমন প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ ও উচ্ছ্বাস। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেন। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া পুরো আসনেই শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়।জয় নিশ্চিত হওয়ার পর বৃহস্পতিবার রাত থেকেই গজারিয়া উপজেলা জুড়ে শুরু হয় আনন্দ মিছিল, উল্লাস ও শুভেচ্ছা বিনিময়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের জোয়ার। অনেকেই মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে জেলা রিটার্নিং অফিসার সৈয়দা নুরমহল আশরাফী আনুষ্ঠানিকভাবে মো. কামরুজ্জামান রতনকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করেন।১৬৯টি ভোটকেন্দ্র ও ১টি পোস্টাল ব্যালট কেন্দ্রসহ মোট ১৭০টি কেন্দ্রের ফলাফলের ভিত্তিতে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সময় ৬ হাজার ৪১৮টি ভোট বাতিল হয়। ভোট প্রদানের হার ছিল ৫৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এই আসনে মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী মুফতি নূর হোসেন নূরানী পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৪৫৬ ভোট। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর সুমন দেওয়ান পেয়েছেন ৬ হাজার ৩৯২ ভোট। বাংলাদেশ লেবার পার্টির আনিছ মোল্লা পেয়েছেন ২৯৪ ভোট।জাতীয় পার্টির আরিফুজ্জামান দিদার পেয়েছেন ৮০৪ ভোট। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির শেখ মো. কামাল হোসেন পেয়েছেন ৩০৪ ভোট এবং বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ মো. শিমুল পেয়েছেন ১১৪ ভোট।৫৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে গজারিয়ার মানুষ শুধু একজন এমপি নয়—ফিরে পেয়েছে রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও সম্মানের জায়গা। কামরুজ্জামান রতনের এই জয় গজারিয়ার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়, যা আগামী দিনে উন্নয়ন, প্রতিনিধিত্ব ও ন্যায্যতার প্রতীক হয়ে থাকবে।